Tuesday, March 19, 2013

বন্ধুত্ব ও একটি ব্যান্ড-এর জন্ম: দূর্গাপুর-এর প্রথম বাংলা ব্যান্ড



বন্ধুত্ব ও একটি ব্যান্ড-এর জন্ম:দূর্গাপুরে  প্রথম বাংলা ব্যান্ড 'প্রবাল '


__________________________________________________________
পর্যায় ১: বিচ্ছেদ ও গীটার
__________________________________________________________


মা বলছেন, "ও কি রে! এখন আবার কোথায় বেরচ্ছিস ? এই এত রাতে?" দীপ্ত বললো, " চিন্তা কোরো না, এখুনি আসছি, রাত  কোথায়? সবে তো আটটা বাজে।"

দীপ্ত বেরিয়ে গেল। মা ভেতর থেকে গলা তুলে বললেন, "দেরী করিস না যেন কাল আবার বাস ধরতে হবে সকাল সকাল, রাত হলে বাবা কিন্তু রাগ করবেন।"

সন্তুদের বাড়ির সামনে স্কুটার থামিয়ে দুবার হর্ন দিতেই সন্তু বেরিয়ে এলো।" আরে আয় আয়, আমি এখুনি তোর্  কথাই ভাবছিলাম।" "না ভেতরে যাব না, তুই বাইরে আয়।" দীপ্ত বললো। "চল  মধুদার দোকান থেকে সিগারেট খাওয়া"।

 "শালা দূর্গাপুর-এর কথা হেবি মনে পড়বে মাইরি। সবচেয়ে বেশি তোর্ কথা। এই লুকিয়ে সিগারেট খাওয়া, পড়া  পালিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়া। আমরা সব কিছু এক সঙ্গে করেছি, কাল থেকে আলাদা হয়ে যাব।"
"এই ছাড় তো! যাচ্ছিস তো শান্তিনিকতন, বাসে চেপে দু ঘন্টা, এই নিয়ে আর ন্যাকামো করিস না, দে মাচিস্  টা দে আর সেন্টি হস্  না। জয়েন্ট-এ পেলে তখন তো লাফাতে লাফাতে যেতিস।" সন্তু নিজের বন্ধুবিছেদ-এর আবেগ চেপে রেখে পরিস্থিতি কে লঘু করতে চাইল। ছোট থেকে, সেই প্রাইমারি স্কুল থেকে ওরা দুজনে এমনটাই করে এসেছে।দীপ্ত একটা হলুদ বাঁধানো বই বের করলো।
"এই নে এটা তোর্ কাছে রাখ"। "এটা" ?, সন্তুর গলায় বিস্ময় ! "এটা তো দেখছি  'Pushkin', এটা আমি কি করবো ?" দীপ্ত বললো "রেখে দে, আমি কাল চলে যাচ্ছি। ভোরবেলা বাস। আর দেখা হবে না।" সন্তু অবাক। "তুই তো ভোগালী দেখছি। আমি শালা কবিতা-র কি বুঝি? আর আমি-ও কি এখানে থাকব নাকি? পলিটেকনিক এন্ট্রান্স দিয়েছি। পেয়ে গেলেই চলে যাব, কলকাতা, বর্ধমান, নর্থ বেঙ্গল কোথায় যেতে হয় কে জানে।মোটমাট দূর্গাপুরে কিছু নেই। বেশ তুই দিচ্চিস যখন রেখে দিলাম।"
"বেশ! সাবধানে যাস আর বেশি মেয়েদের ঝাড়ি  মরিস না। মনে আছে তো ! স্বাস্থের পক্ষে ক্ষতিকর।"

দীপ্ত বাসে করে যেতে যেতে সন্তু-র শেষ কথাগুলো ভাবছিলো আর মনে মনে হাসছিল।কিছুদিন বাদেই শান্তিনিকেতন থেকে দূর্গাপুর ফিরতে হলো দীপ্ত কে। টাকা চাই, সাইকেল কিনতে হবে। শান্তিনিকেতন-এ সাইকেল ছাড়া ভীষণ অসুবিধে। দুদিনের জন্য বাড়ী এসেই ফোন করলো সন্তু কে। জানতে পারল, ও দূর্গাপুরে নেই। কলকাতায় মেসে থেকে মৌলালি তে একটা পলিটেকনিক-এ পড়ছে - মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং। মা বললেন, "সন্তু-র মা ফোন করে জনিয়েছিলেন, তুই তো জিজ্ঞেস করিস নি। করলেই বলতাম।" দীপ্ত জানতো। ওর মন খারাপ হচ্ছে না। ওর অন্যান্য বন্ধুরা-ও তো সবাই বিভিন্ন জায়গায় পড়তে চলে গেছে। হয়ত এটাই ভবিতব্য। মা বললেন, "ইউনিভার্সিটি গেছো, এইবার দূর্গাপুর-এর বন্ধুদের ভুলে যাও, ওখানে নতুন বন্ধু হবে, আসতে আসতে স্কুল-এর বন্ধুদের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে-ই যায়। এরপর চাকরি-বাকরি, সবাই এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাবে। মন দিয়ে লেখাপড়া কর আর প্রত্যেক সপ্তাহান্তে বাড়ি আসতে হবে না।" দীপ্ত মনে মনে জানত মা কত ভুল একটা মন্তব্য করলেন। ও জানতো শান্তিনিকেতন ওর মনোজগতের অনেকটাই অধিকার করে ফেলবে ধীরে ধীরে, তবু এই পিছুটান, দুর্গাপুরের প্রতি, যার অনেকটা-ই সন্তু-র জন্য, অন্যান্য বন্ধুদের জন্য, সেটা কি ভুল? সেটা কি ক্রমশ: অস্পষ্ট হয়ে যাবে? দীপ্ত ভাবলো, দু মাস পরেই শীতের ছুটি। তখন সন্তু নিশ্চয় দূর্গাপুরে আসবে আর দেখা করবে।

শীতের ছুটিতে সন্তু এসেছিল। আসলে সন্তু এক-দু সপ্তাহ অন্তর দূর্গাপুর আসছিল কিন্তু দীপ্তর সঙ্গে যোগাযোগটাই হচ্ছিল না। ফোন ছাড়া আর তো কোনো উপায় নেই যোগাযোগ করার। কিন্তু ফোন-এ কথা বলতে গেলে তো দুজন কে একই সময় দূর্গাপুরে থাকতে হবে। সেটা-ই হয়ে উঠছিল না। অথচ কত কি গল্প করার আছে দীপ্ত-র সাথে। মানুষ যে কতরকমের হয়, তাদের কথাবার্তা, তাদের ব্যবহার, তাদের জীবনের উদ্দেশ্য, গন্তব্য, তাদের পারিবারিক পটভূমি, অর্থনৈতিক পটভূমি, সন্তু-র কাছে কত অজানা। দুর্গাপুরের জীবন যেন একটা খোলস-এর মধ্যে অতিবাহিত হয়, বাইরের জগতটা কত বর্ণময়। নিজেকে মেলে ধরছিল সন্তু বাইরের জগতের কাছে আর শুষে নিচ্ছিল বাইরের পৃথিবীর রং, রূপ, গন্ধ।

বড়দিনের ছুটি তে বাড়ি ফিরেই দীপ্ত  এক ছুটে সন্তুদের বাড়ি। "কাকিমা, সন্তু আছে? কবে আসবে? ছুটি তে আসবে তো?" সন্তু-র মা বললেন, আজ বিকেলের ট্রেন-এই আসছে সন্তু।"কিন্তু বাবা, ওকে রাত্রে একটু ঘুমোতে দিবি তো? আমি কাল সকালে না হয় ফোন করতে বলবো।"

ভেতরের ছটফটানি টা কমছেই না। সকাল মানে তো ১১টা। চিরকাল ওই সময় ঘুম থেকে উঠত সন্তু। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলল, সাড়ে তিনটে-র সময় বাজলো ফোন। "দীপ্ত বলছিস?" "শালা এতক্ষণে সময় হলো ফোন করার?" দীপ্ত-র গলায় ছদ্ম অভিমান। "মহাশক্তি ভান্ডার-এ চলে আয়, চা খাব।" বলল সন্তু। চন্ডিদাস মার্কেট-এ মিষ্টির দোকান, "মহাশক্তি ভান্ডার"; এমন রসগোল্লার রস দিয়ে সিঙ্গাড়া -র চাটনি বানায়, ভেবেই দীপ্ত-র জীভে জল এসে গেল। উফ! কতদিন সিঙ্গাড়া খাওয়া হয় নি।
মহাশক্তি-র চা আর সিঙ্গাড়া খেতে খেতে তারপর অনেক গল্প। সন্তু ফিল্টার ছাড়া সিগারেট খাচ্ছে। দীপ্ত দেখল কিছু পরিবর্তন এসেছে সন্তুর মধ্যে। অনেক নতুন অভিজ্ঞতার কথা আলোচনার পরে সন্তু বললো, "খুব lonely feel করি জানিস। কলকাতার life একদম আলাদা। মেসের ছেলেগুলো শালা এক একটা hypocrite. কাউকে বিশ্বাস করা যায় না। সবাই ধান্ধাবাজ। আর বোধয় কেউ বন্ধু হবে না।
তোর্ hostel-এর ঠিকানা টা দে। চিঠি লিখব। অনেক গল্প আছে। এখন উঠি।"
আরো দু-তিন মাস পরে চিঠি লিখে সন্তু জানালো, ও একটা guitar কিনেছে। সেকেন্ড হ্যান্ড এবং বাজানো শিখছে মেসের একজন সিনিয়র-এর কাছ থেকে। জীবন-এ প্রথম গঞ্জিকা সেবন-এর অভিজ্ঞতার কথা-ও লিখেছে। দীপ্ত দেরী করত না, নীল ইংল্যান্ড লেটার পেলেই, সাথে সাথে লাইব্রেরি গিয়ে পড়ে ফেলত, আর ওখানে বসেই উত্তর লিখে পাঠিয়ে দিত। দীপ্ত -ও ওর কলেজ জীবনের অভিজ্ঞতা সন্তুকে লিখে জানাতো। ওর গায়ক হিসেবে পরিচিতি হয়েছে, ক্লাস ফাঁকি দিয়ে canteen -এ বসে গান-এর কথা, শান্তিনিকেতন-এর ছাত্র রাজনীতি, লেখাপড়া-র চাপ, হোস্টেল-এ সিনিয়র দের ragging. কিছুই বাদ দিত না। একবার সন্তু হঠাৎ করে লিখল, "তুই কি কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছিস নাকি বলতো ? একটা কবিতা পাঠা, একটু যেন লিরিকাল হয়। দীপ্ত পাঠিয়েছিল, "ঘড়ি ও ঘড়ি, তোর সময় বয়ে চলে টিক টিক টিক ......."

এর পর গরমের ছুটিতে দীপ্ত বাড়ি গিয়ে সন্তুর কাছে শুনলো ওই কবিতাটাকে কি ভাবে সুরে বেঁধে সন্তু গান-এ রুপান্তরিত করেছে। অসাধারণ। "কি করেছিস রে!" সন্তু ওর গিটার টা -ও দেখালো আর কি ভাবে বাজাতে হয় সেটাও বুঝিয়ে দিল। দীপ্ত-র বিশ্বাস-ই হছে না। ওর কবিতা, যা ওর কাছে শুধু একটাই মাত্র অবয়ব-এ ধরা দিত, তার একটা অন্য চেহারা যে হতে পারে এটা ওর মধ্যে একটা সাংঘাতিক উত্তেজনা-র জন্ম দিল। গান গাইতে পারলেও দীপ্ত কখনই সন্তু কে ওই জায়গায় সহচর হিসেবে ভাবে নি কারণ সন্তু ভালবাসত western music. এখন সেই western music  আর বাংলা গান কিরকম মিলে গিয়েছে যেন। এটা একটা অসাধারণ effort. এটাকে appreciate করতেই হবে। সেই রাতে ঘুমই হলো না দীপ্তর।
পরের দিন সকালে সন্তুদের বাড়ি গিয়ে গানটা আবার শুনতে চাইল দীপ্ত। সন্তু একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল "নে আমার সঙ্গে ধর।"
গান চলতে থাকলো। কোথা দিয়ে যে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে কেউ টের পাচ্ছে না। চেনা গান একের পর এক গাইতে লাগলো দীপ্ত আর সন্তু চেষ্টা করতে থাকলো গীটারে ওকে সঙ্গ দেবার।


_________________________________________________________________________________
পর্যায় ২: বাংলা গানের পালাবদল ও প্রবাল
_________________________________________________________________________________ 


"তুই কি গীটার শেখার স্কুল-এ ভর্তি হয়েছিস?" দীপ্তর  প্রশ্ন টা স্বাভাবিক। এর আগে ও acoustic spanish guitar দেখে-ই নি। যা লোকে বাজায় তা হলো hawaian guitar আর সেই খর বায়ু বয় বেগে ......
তুই খেপেছিস? আমার মেসে একটা ছেলে আছে সিদ্ধার্থ , ও একটা ব্যান্ড-এ গীটার বাজায় , ও আমাকে শেখাচ্ছে। সিদ্ধার্থ তোর্ গান টা কলেজ ফেস্ট-এ গেয়ে অ্যাওয়ার্ড জিতেছে। In fact, ও যে ব্যান্ড-এ বাজায়, কলকাকলি , ওরা এই গান টা এত পছন্দ করেছে যে কিনে নিতে চাইছে। আর তোকে আরো লিখতে বলেছে। তুই জানিস না কলকাতায় কি চলছে এখন। লোকে পাগল। সুমন চট্টোপাধ্যায়-এর  'তোমাকে চাই' শোনার পর থেকে বাংলা গানের definition বদলে গেছে। সবাই মনে করছে যে ভাষায় কথা বলি, সেই ভাষায় গান লেখা যায় এবং গাওয়া যায়।
দীপ্ত জানে এই সব কথা। পত্র-পত্রিকায় পড়েছে 'জীবনমুখী' গান নিয়ে নানা বিতর্ক। কিন্তু ও গান কে গান হিসেবেই ভাবতে শিখেছে ছোটবেলা থেকে।
"সন্তু শোন। তুই সুর দিবি আমি গান লিখব। আমরা কলকাকলি কে গান বেচবো না।"
সেই রাতে দীপ্ত লিখতে বসলো গান। কবিতা নয়, গান এবং বুঝতে পারল গান লেখা কত কঠিন। কিন্তু নিজের মনের আবেগ, গান করে গেয়ে যতটা সন্তুষ্ট হওয়া যায়, কবিতা আবৃত্তি করে বোধয় ততটা হয় না। এক অত্যন্ত কঠিন অধ্যায় শুরু হলো দীপ্ত-র জীবনে। গান-এর ব্যাকরণ জানা নেই, কবিতার-ও তথৈবচ। কিন্ত আবেগ আছে, নিজেকে প্রকাশ করার এক অদম্য ইচ্ছে সারাক্ষণ তাড়া করে বেড়াচ্ছে। এই ব্যাকরণ যেন ভাবের জগতে কারফিউ জারি করে ফেলছে। না কি দীপ্তকে আরো সমৃদ্ধ হতে বলছে? ভাষার ওপরে আরো দখল আরো ছন্দের ওপরে দক্ষতা চাই। কিন্তু ও যাই লিখুক, গীটারের ছন্দে ফেলতেই কিরকম যেন ম্যাড়মেড়ে হয়ে যাছে। আচ্ছা সন্তু ওর গীটার টা কবিতা অনুযায়ী বদলাতে পারে না? সন্তু নারাজ।" আমি হিন্দি গানের মত করে গীটার বাজাতে পারব না। আগেই মাঝে মাঝে শোনার জন্য দিত, এবারে-ও John Denver-এর দুটো cassette ধরিয়ে দিয়ে বলল এগুলো ভালো করে শুনে দেখ, গীটার কি ভাবে বেজেছে এখানে। আরো একটা জায়গায় অসুবিধে হছিল। সন্তু বলতে শুরু করেছিল, তুই বাংলা আর হিন্দি গান গেয়ে গেয়ে গায়কী টা এমন করে ফেলেছিস যে সুরের change গুলো শার্প হছে না। সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত কিম্ভুতকিমাকার ব্যাপার হচ্ছে।

দীপ্ত একদিন ঘুম থেকে উঠে মা কে বলল আমি গান শিখব।

"সে কি রে ? হঠাৎ হলো কি তোর?" মায়ের বিস্ময়।

দীপ্তর মা গান জানতেন। হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইতেও পারতেন। ছেলে মায়ের গানের সঙ্গে সঙ্গত করবে ভেবে ছেলে কে তবলায় তালিম দিয়েছিলেন।কিন্তু দীপ্ত কোনদিন গান শিখতে চায় নি। ছোট থেকেই ভাবত মেয়েরা গান করে আর ছেলেরা তবলা বাজায়। পরে বড় হয়ে নিজে নিজেই  গান ভালোবেসে গান গাইত। মনে করত তালিম দরকার নেই। কিন্তু বোধয় দীপ্ত ভুল।

মা বললেন, প্রথমে 'সা ' তে 'সা' মেলা দেখি। দীপ্ত পারবে না তা হয় নাকি। কলেজ ক্যান্টিন-এর নামকরা গায়ক সে, কিশোর কুমার-এর সবকটা গান মুখস্থ। কিন্তু মা বলছেন 'হচ্ছে না। ঠিক সুরে বসছে না।' এই সুর সাধনা চলতে থাকলো। পড়াশুনা লাটে উঠলো। যখনি ছুটি তে বাড়ি আসতো গান-এর রেওয়াজ চলত। বইমেলা থেকে পাশ্চাত্য সঙ্গীত শিক্ষার বই, হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিক্ষার বই কিনলো দীপ্ত। যেখান থেকে পেত গান শুনত। হিন্দুস্থানী, পাশ্চাত্য jazz, reggae, rock and roll, বাউল, গম্ভীরা, যাত্রাগান; বাড়ি তে প্রায় সাড়ে তিনশ গানের cassette জমে গেল। কিন্তু এই ব্যাকরণ-এর পাকে পড়ে গান শুনে যে ভালো লাগা আগে তৈরি হত, সেটা হারিয়ে গেল। গান শুনলেই তাকে কেটে ছিঁড়ে আনুপূর্বিক মূল্যায়ন করতে থাকত।
দীপ্ত-র পড়াশুনা-র মাথা খারাপ ছিল না শুধু কম্পিটিটিভ পরীক্ষায় কখনো উতরাতে পারে নি। গানের জন্য পড়া ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এই ভেবে বাড়িতে তুলকালাম শুরু হয়ে গেল। অবশ্য তাতে খুব কিছু যে এসে যেত তা নয়; বাড়ির লোকে কখনই পৃথিবীটা ওর চোখ দিয়ে দেখতে চায় নি।
এর মধ্যে একবার ছুটির সময় এসে শুনলো যে সন্তু কলকাতা ছেড়ে চলে আসছে।ওর মা বললেন, আর বলিস না, ওর সাংঘাতিক জন্ডিস হয়েছিল। ও বোধয় ওখানে ঠিক adjust করতে পারছিল না। আমরা ওকে বর্ধমান ট্রান্সফার করে নিয়েছি। শুনে একটু খারাপ বোধ করলো দীপ্ত কিন্তু মনে মনে খুশি না হয়ে পারল না। তার মানে এবার যখনি বাড়ি আসবে সন্তুর সঙ্গে দেখা হবে।

সন্তু ক্রমে ক্রমে পারদর্শী হয়ে উঠছিল। এর মধ্যে প্রায় গোটা  বারো গান ওরা তৈরি করেছিল যেগুলো শুনে বন্ধু বান্ধব, পাড়া -প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজন নানা রকম মন্তব্য করেছে। দীপ্ত এর মধ্যে শান্তিনিকেতনে থাকার সুবাদে মঞ্চে অনুষ্ঠান করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।ওখানকার নানা গুণী মানুষের সংস্পর্শে আসার সুযোগ ঘটেছে আর তাঁদের কাছে গানের পাঠ নেবার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। দীপ্তর মনে একটা ভাবনা অনেকদিন ধরে ঘুরপাক খাচ্ছিল। বললো, "চল পুজোর সময় একটা অনুষ্ঠান করা যাক।দেখি দুর্গাপুরের মানুষ কি ভাবে নিচ্ছে আমাদের।" সন্তু অবাক। "মানে? এই একটা ফাটা গীটার নিয়ে মঞ্চে? এখানকার লোকে orchestra শুনে অভ্যস্ত, মারবে আমাদের।" "না:, ঘাবড়াস না, আমি সামলাবো।", বললো দীপ্ত।

ওরা দেখা করলো সুকল্যানদার সঙ্গে। চতুরঙ্গ পুজো কমিটির সেক্রেটারি। উনি বললেন, "কি চাই? তোরা কে? ওরা বললো "আমরা গান বাঁধি আর গান গাই। পুজোর মঞ্চে একটা সুযোগ দেবেন?" সুকল্যানদার চোখ মুখ ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে, "গান? তোরা ? ওই গীটার দিয়ে? তাও মাত্র দুজন?" ওদের সংক্ষিপ্ত উত্তর "হ্যা।"

দুদিন বাদে সুকল্যানদা সন্তু কে ডেকে বললেন, "দেখ বাপু ডোবাবি  না তো? কলকাতা থেকে শিল্পী আসছেন, আধ ঘন্টা-র স্লট দিতে পারি, quality ম্যাচ করতে হবে। কিন্তু টাকা-পয়সা দিতে পারব না।"
সন্তু বলেছিল "টাকা পয়সা লাগবে না, সুযোগ দিন।" দীপ্ত অন্য কথা ভাবছিল। একটা rhythm ইনস্ট্রুমেন্ট না হলে মুশকিল হয়ে যাছে। সন্তু এখনো গীটার টা সেই দক্ষতায় বাজাতে পারছে না। কিন্তু কে আসবে ওদের সাথে বাজাতে ? এখানকার সব বাজনদার রা orchestra পার্টি তে বাজায়, ওদের ডাকলে তো টাকা দিতে হবে। টাকা কোথায়? এমনিতেই বাড়িতে গান বাজনা নিয়ে অশান্তি হতে শুরু হয়েছে। এরপর টাকা চাইলে আর দেখতে হবে না! মাথায় এলো সুমিত-এর কথা। স্কুলের বন্ধু। তবলা বাজাত। সুমিতকে ডেকে বললো, একটু অন্য flavor চাই, তবলা টা  ঠিক এখানে যাবে না বুঝলি! অনুষ্ঠান-এর দিন সুমিত একটা মাটির হাঁড়ি নিয়ে উপস্থিত হলো। বললো, একে বলে ঘটম। মঞ্চে ওঠার আগে সন্তুর হাত ঘামছে, দীপ্ত সিগারেট খেয়ে গলা পরিষ্কার করছে, এমন সময় সুকল্যানদা এসে বললেন, কি নাম announce করব? সন্তু চটপট বললো, "প্রবাল, মানে বলুন প্রবাল গোষ্ঠী গান গাইবে।" সুকল্যানদা ঘোষণা করলেন, "এখন মঞ্চে আসছেন প্রবাল গোষ্ঠির শীল্পিবৃন্দ, পরিবেশন করবেন আধুনিক বাংলা গান।" মঞ্চ ছেড়ে চলে আসছিলেন, ফিরে গিয়ে আবার বললেন, এই গান ওরা নিজেরা লিখেছেন এবং সুর দিয়েছেন।" ব্যাস।প্রবাল গোষ্ঠির জন্ম হয়ে গেল।দীপ্ত শুনতে পাচ্ছে দর্শকদের মধ্যে অনুরণন, "এই সুকল্যানদা যে কোথা থেকে সব ধরে নিয়ে আসে?" সত্যি তো ১৯৯৩-৯৪ এর দূর্গাপুর-এ এই ধরনের একটা ঘটনা ঘটানোর সাহস দেখালেন সুকল্যানদা। মনে মনে ওনার  প্রতি শ্রদ্ধা হলো দীপ্তর।
        
মঞ্চে চিরকালই দীপ্ত ভীষণ সপ্রতিভ। শ্রদ্ধেয় সলিল চৌধুরী কে শ্রদ্ধা জানিয়ে শুরু করলো গান।      
একটা গান খুব প্রিয় ছিল দীপ্তর .."ও প্রিয়তমা তোমায়, ওই রাতের আকাশ বলেছে, দূর কোন আলোর দেশে -এ নিয়ে যাবে একদিন ......" যখন শেষ হলো, সব কলরব থেমে গেছে। তিন মিনিট বাদে অকুন্ঠ হাততালি তে ভরে উঠলো মাঠ। ওরা সব মিলিয়ে তের টা  গান গেয়েছিল। যখন মঞ্চ থেকে নেমে যাচ্ছিল, দর্শকরা উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছেন, সুকল্যানদা সন্তুর হাতে দুশো টাকা গুঁজে দিলেন। ওই টাকা টা সন্তুর মা সরস্বতী মূর্তির পায়ের কাছে রেখে দিয়েছিলেন।

দু বছর পর। দীপ্ত উদ্দেশ্যহীন হাঁটছিল। শান্তিনিকেতন-এর মাটি বৃষ্টি তে ভেজে না। তাও ধীরে সাবধানে পা ফেলে একা library থেকে hostel-এর দিকে আসছিল। এখন আর সময় হয় না। পড়ার  ভীষণ চাপ। সন্তু চিঠি লিখে জানায় "আজ দূর্গাপুর কলেজ-এ অনুষ্ঠান, আজ steel TV থেকে ডেকেছে, অমুকদিন আর জি কর-এ competition এ যাচ্ছি। দীপ্ত এসব থেকে অনেক দূরে। কিন্ত এখনো প্রবাল-এর জন্য ওই গান লেখে। সন্তু ওকে জানায়, প্রবাল কলেবর-এ বেড়েছে।কোথায় কোন 'Plasma' গোষ্ঠির এক পাগল keyboard player এসেছিল। একদিন বলল একজন anglo-Indian আমাদের সঙ্গে ইংরেজি তে medley করবে। ওফফ ! দীপ্ত পাগল হয়ে যাবে। বড় টানাপোড়েন। লেখাপড়া না  গান? কোন দিকে যাবে? দুটো বোধয় আর একসাথে হবে না। দীপ্ত ধীরে পা ফেলে হেঁটে চললো।       


_______________________________________________________________

বি: দ্র: এই কাহিনী  ষোলআনা সত্যি ঘটনার ওপরে ভিত্তি করে রচিত।শুধু চরিত্রদের ব্যক্তিগত জীবন গোপনীয় রাখতে চরিত্রদের নাম বদলে দেওয়া হযেছে। প্রতিষ্ঠান বা জায়গার নাম একই রাখা হয়েছে।

                       
               










Wednesday, February 6, 2013

Nature, mood, ideas

তুষার মোড়া
মেঘ ধূসর কালো
জানালা জোড়া।

অরুণ পর্ণ 
তুষার সমাহিত
তবু ও উষ্ণ।

টুকরো কথা
ক্লান্ত দুপুর কাল ও
দূরভাষী মন।

আশা-নিরাশা
মেঘ-রোদে মেশানো
অনবরত।

এক পাহাড় মেঘ
অযুত জলছুরি
বিধছে যেন।